গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে গণপূর্ত অধিদপ্তর বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নির্মাণ ও তার সংস্কার কাজের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রণালয়টির উপর নজরদারী ও ক্ষমতার ভাগ বসাতে দেশের ক্ষমতাশীলরা সর্বদাই তৎপর থাকে। এই মন্ত্রণালয় ঘিরে অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়নে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার কাজ সম্পাদন হয়। আর এ কারণেই এই মন্ত্রণালয়টি অন্যান্য মন্ত্রণালয় থেকে বেশী গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ করে ঠিকাদার ও ব্যবসায়ীদের নিকট। গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে সুযোগ সুবিধা গ্রহন করে এর সাথে সম্পৃক্ত ঠিকাদার ও কিছু দুর্নীতি পরায়ণ প্রকৌশলী শত শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছে। এই কার্যক্রম অতীতেও ছিলো এবং বর্তমানেও চলমান আছে। একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের মূল ভুমিকার কর্তারা জড়িত। কর্তাদের পুজি করেই কিছু প্রকৌশলী হয়ে উঠেছে বেপরোয়া। তার মধ্যে অন্যতম ঢাকা গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-১০ এর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল হালিম। অভিযোগ রয়েছে, কমিশনের বিনিময়ে কাজ প্রদান, উন্নয়ন কাজ না করেই সরকারি বরাদ্দের কোটি কোটি টাকা তুলে নিয়ে ঠিকাদারের সাথে ভাগাভাগি, চাকুরী জীবনে অসততার আশ্রয় নিয়ে অঢেল ধন সম্পদের মালিক এবং গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ২০২৪ সালে আব্দুল হালিমের নিম্নমানের লিফট ও রক্ষণাবেক্ষণের অবহেলা কান্ডে একই বছরে দুইজন রোগীর মৃত্যু হয়। লিফটকান্ড ঘটনায় মন্ত্রণালয় থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার আদেশ দিলেও অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারের আস্থাভাজন হওয়ায় আব্দুল হালিম এখনও বহাল তবিয়তে।
তিনি যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় ছিলেন তখনই তার গুনগান গেয়েছেন। ২০২২ সালে ঢাকা গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম- ৮ নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব থাকাকালীন সময়ে স্টাফ অফিসার জোবায়ের আহমেদ স্বাস্থ্যখাতের সব টেন্ডারে আব্দুল হালিমের নির্দেশে ঠিকাদারদের কাছ থেকে প্রতি টেন্ডারে ৫ শতাংশ (প্রাক্কলিত দর) অনুযায়ী কাজ দিয়েছে। পিপিআর অনুযায়ী এলটিএম (লিমিটেড টেন্ডার মেথড) অনুযায়ী দরপত্র হওয়ার কথা থাকলেও তা না করে ওটিএম এর মাধ্যমে টেন্ডার আহবান করে কাজ দিয়ে বিপুল অর্থ লোপাট করেছে।
এছাড়াও স্টাফ অফিসার জোবায়ের টেন্ডার আইডি হাইড করে নির্দিষ্ট ঠিকাদার’দের আইডি ও রেট দেখিয়ে ইচ্ছেঅনুযায়ী দাম হাকাতো। ‘সাধারণত পিপিআর অনুযায়ী ইজিপিতে এলটিএম এর বাইরে দরপত্র আহবানের সুযোগ নেই। এলটিএম এর ক্ষেত্রে প্রতি টেন্ডারে ১০ শতাংশ লেসে দর জমা হয়ে, লটারির মাধ্যমে কাজ দেওয়া হয়। এতে সরকারের সিডিউল বেশি বিক্রি হওয়ায় সরকারি কোষাগারে টাকা জমা হওয়ার পাশাপাশি ১০ শতাংশ লেসের কারনে সরকারের অর্থ সাশ্রয় হয়’। হালিম ও জোবায়ের সিন্ডিকেট নিজেদের মনোনীত ব্যক্তিদের প্রাক্কলিত মুল্যে কাজ দেওয়ার কারনে সরকারের ১০ শতাংশ লেসের অর্থ লোকসান হয়। উক্ত ১০ শতাংশ টাকা প্রকৌশলী এবং ঠিকাদার ভাগ করে নেয় তাদের নির্ধারিত কমিশনের বাইরে। সংস্লিষ্ট সুত্র জানায়, স্বাস্থ্য খাতে বেশির ভাগ দরপত্রে মাত্র ১ জন ঠিকাদার অংশ নিয়েছে যা তদন্ত করলে বেরিয়ে আসবে। অভিযোগ রয়েছে, ‘যারা ৫ শতাংশ টাকা দিতে রাজি হয়নি তাদেরকে ১০ শতাংশ লেসে কাজ নিতে বাধ্য করা হয়েছে’।
২০২২-২৩ অর্থবছরের শেষ মুহুর্তে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের বৈদ্যুতিক কাজ ও তিনটি এয়ারকুলার লাগানোর জন্য এক কোটি ৩৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। হাসপাতালের ২য় তলা প্রশাসনিক ভবনে বৈদ্যুতিক ওয়ারিং ও সুইচ পরিবর্তনের জন্য ৩৩ লাখ ৫৪ হাজার টাকা, গার্ডেন লাইট ও সিকিউরিটি লাইটের জন্য ২৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা, ইমার্জেন্সি ব্লাকে এসির জন্য ১৫ লাখ ৯৬ হাজার টাকা, রেটিনা ব্লাকের এসির জন্য ২৯ লাখ ৫৫ হাজার ও প্রশাসনিক ব্লকে ভিআরইএফ এসির জন্য ২৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সাধারণত অর্থবছরের শেষমূহুর্তে প্রকল্পের নামে অর্থ-বরাদ্দ দিয়ে লুটপাটের সিদ্ধান্ত নিয়ে হালিম-জোবায়ের সিন্ডিকেট নানা তড়িঘড়ি করেছিলেন। মূলত আব্দুল হালিম অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর মুরিদ ও আওয়ামী লীগের কুষ্টিয়া ৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবউল আলম হানিফের আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় অর্থবরাদ্দে কোনো বাধাবিপত্তি হতো না।
এছাড়াও ২০২১ সালে আশকোনাস্থ হজ্ব ক্যাম্পের পাওয়ার লাইন, কম্বাাইন্ড সুইচ সকেট পরিবর্তনসহ আনুষঙ্গিক বৈদ্যুতিক কাজের অর্থ বরাদ্দ করানো হলেও নিজের পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ ছিলো। কারিগরি অনুমোদন পেতে নিজ উদ্যোগেই টেন্ডার নেওয়ার প্রস্তাব দেন গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-৮ (মিরপুর) এর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল হালিম। গণপূর্ত ই/এম উপবিভাগ-১৬ (মিরপুর) একজন উপ- সহকারী প্রকৌশলীর কাছ থেকে প্রাক্কলন পেতে সহযোগিতাও করেন তিনি। উক্ত প্রাক্কলনের কারিগরি অনুমোদন পেতে আর্থিক সুবিধা নিয়ে স্বাক্ষর করেন আব্দুল হালিম।
নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল হালিম মূলতঃ গণপূর্ত সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আক্তারের মুরিদ। আর সেই সুবাদে তিনি ভাগিয়েছেন ভালো ভালো পোস্টিং এবং বড় অঙ্কের কাজ। আমাদের অনুসন্ধান ও বিভিন্ন তথ্য সূত্রে তার দুর্নীতি ও অনিয়ম যে কোন নির্বাহী প্রকৌশলীকে বহুগুণ ছাড়িয়ে গিয়েছে। বর্তমান তিনি প্রধান কার্যালয়ে সংযুক্ত আছেন।
ঢাকার মোহাম্মদপুর ও উত্তরায় রয়েছে তার শত কোটি টাকার সম্পদ। তার গ্রামের তথ্যসূত্র শ্বশুরবাড়ি এলাকায় বগুড়া ক্যান্টমেন্টের ফ্লাট লেকের পাশেও তিনি কিনেছেন অঢেল সম্পদ ও জমি। গণপূর্তে যে কয়েকজন দুর্নীতিবাজ রাঘববোয়াল রয়েছে আব্দুল হালিম তার মধ্যে অন্যতম মাস্টারমাইন্ড।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে কিভাবে লিফট কান্ডের দুর্নীতি থেকে আব্দুল হালিমকে পার করে দেওয়া হলো। গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন মেডিকেল কলেজ যে কোম্পানির লিফট দেওয়ার কথা ছিল দরপত্র অনুযায়ী ইতালির বিখ্যাত মভি ব্র্যান্ডের। কিন্তু ইলেকট্রিক মোটর ছাড়া কেবিন ও যন্ত্র দেওয়া হয়েছে চীনের। নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহার করায় লোড বেশি হলেই আটকা পড়ে লিফট। প্রতি মাসের রক্ষণাবেক্ষণ এর কথা থাকলেও তা বাস্তবে হতো না। অতএব লিফট দুর্ঘটনার সাথে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি উঠেছে। পরপর দুটি লিফট দুর্ঘটনা ঘটেছে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন মেডিকেল কলেজে এর দায় দায়িত্ব কার? গণপূর্ত অধিদপ্তরের দায় এড়াতে পারে কিনা? ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় অত্যন্ত ক্ষমতাধর ছিল এই দুর্নীতির বরপুত্র আব্দুল হালিম। জুলাই আন্দোলনের পর কেন তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয় নাই এই দাবী মৃত্যুর পরিবারগুলো।
আমাদের অনুসন্ধানী টিম এ নিয়ে বিস্তারিত কাজ করছে।
ঢাকা, কুষ্টিয়া ও বগুড়াতে সম্পদের পাহাড় কিভাবে গড়ে তুললো এই প্রকৌশলী তা নিয়েও আমাদের অনুসন্ধান চলমান।